বাঙালির সংস্কৃতি ও এক আধজন মৃণাল সেনেদের চলে যাওয়া



বাঙালির সংস্কৃতি ও
এক আধজন মৃণাল সেনেদের চলে যাওয়া

কলকাতা ৭১ এর মৃণাল সেন চলে গেলেন। সত্যজিৎ ঋত্বিক মৃণাল পুরানো কলকতার গল্পে একসাথে উচ্চারিত তিনটি নামের শেষজনও চলে গেলেন। না তাতে কলকতার সংস্কৃতি জগতের নতুন কোন ক্ষতি হয় নি। আগের দুইজন চলে যাওয়ার সময়ও হয়েছিল না। ক্ষতি হয় নি বঙ্গসংস্কৃতিরও। এঁদের সাথে বিশ্বের তাবড় তাবড় ব্যক্তিতের যে আত্মিক যোগ ছিল, আপামর বাঙালি বা এমন কি তথাকথিত ক্যালক্যাটা ইনটেলেকচ্যুয়ালসদেরও সেরকম কোন সংযোগ ছিল কি? না না হঠাৎ করে নড়ে চড়ে বসার কোন দরকার নাই। পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকের সময় সীমায় বা এমন কি আশির দশকেও এঁদের তৈরী সিনেমাগুলি বাম্পার হিট সুপার হিট হতো না কেন মশাই? তখন তো আপনার বাবা কাকা মামা মেশো জ্যাঠামশাইদের যুগ। হলগুলির মালিকরা এঁদের সিনেমার প্রিন্ট এনে মাছি তাড়াতেন কেন? কেন ঋত্বিক ঘটককে বলতে হতো সিনেমা ফ্লপ করে নি, ফ্লপ করেছে দর্শক? শোনা যায় ভাবনীপুরের ইন্দিরা হলে যাতে আর এক সপ্তাহ মৃণাল সেনের সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবি ‘কোরাস’ চলে তার জন্যে মৃণালবাবু নিজের পকেট থেকেই সে যুগে ২০০ টাকা তাঁর অনুগামীদের দিয়ে বলে ছিলেন সেই টাকায় যত টিকিট কাটা যায়, কেটে ফ্রিতে বিলিয়ে দিতে। অন্তত আর একটি সপ্তাহ যাতে ছবিটি হলে থাকে। এই সেই ভবানীপুর, পুরানো কলকতার গর্ব। সংস্কৃতির নাকি পীঠস্থান। সেখানে ঋত্বিক মৃণালের সিনেমা দেখার মতো পাবলিক খুঁজে পাওয়াই যেত না সেই পুরানো কলকাতায়। ষাঠের দশকে ঋত্বিকের ‘কোমলগান্ধার’ এর মতো যুগান্তকারী সিনেমাও সাতদিন চলে নি খোদ ভবানীপুরেও। সারা বাংলা বাদ দিলেও সে যুগে খোদ সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতায় উচ্চশিক্ষিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী বুদ্ধিজীবী পেশাজীবী কলকাতাবাসীর কোন অভাব ছিল কি? নিশ্চয় ছিল না। অভাব ছিল প্রকৃত শিক্ষিত মৌলিক চিন্তাক্ষম জনমানসের, নয়তো এঁদের তৈরী সিনেমাগুলি প্রায় ফাঁকা হলে প্রদর্শিত হতো কেন? যে বাবা কাকা জ্যাঠা মামা মেশোদের নিয়ে গর্ব করি আমরা, তাঁদেরকে তো বোম্বাইমা্র্কা হিন্দীসিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত দিব্যি! আর একটু সংস্কৃতিমনস্ক হলে টালিগঞ্জের উত্তম সুচিত্রার সিনেমার টিকিট ব্ল্যাকে কেনা, এই তো পুরানো কলকাতার সংস্কৃতির ইতিহাস। যেখানে সত্যজিত ঋত্বিক মৃণালেরা চিরকারই বাঙালির কাছে ব্রাত্য থেকে গিয়েছেন আগাগোড়া। সত্যজিতের যেটুকু জনপ্রিয়তা তাও গুপিবাঘা আর ফেলুদার বেশি নয়। সেখানেই সীমাব্ধ বাঙালি তথা কলকাতাবাসীর সাংস্কৃতিবোধের দিগন্ত। তাই মৃণাল সেনরা চলে গেলে বাঙালি বা কলকাতাবাসীদের কিছুই এসে যায় না। যাবে না।

এটাই কলকাতা। এটাই বাংলা। এটাই বাঙালির সংস্কৃতি। চল্লিশের দশক থেকে শুরু করে বিগত আট দশক এই কলকাতা থেকে, এই বাংলা থেকে কত লক্ষ কোটি টাকা মুনাফা তুলে নিয়ে গিয়েছে বোম্বাই মার্কা হিন্দী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রী। তাতে বাংলা ও বাঙালির অর্থনীতির কোন উন্নতি ঘটে নি। উন্নতি ঘটেছে অবাঙালিদের ব্যবসা বাণিজ্যের। যে টালিগঞ্জের উত্তম-সুচিত্রা ঘরানার জনপ্রিয় সিনেমার স্বর্ণযুগ নিয়ে আমাদের এত গর্ব, তারও মুনাফা অবাঙালিদের পকেটেই। বাঙালি শুধুই ফার্স্ট ডে ফার্ষ্ট শোয়ের লাইনে দাঁড়িয়েছে। আর হলকে হল হাউসফুল করে দিয়েছে। যদিও বাণিজ্যিক সিনেমার সেই স্বর্ণযুগ সেই ভাবে আজ আর নাই। কিন্তু বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদের লাইন কোনদিনও সত্যজিৎ ঋত্বিক মৃণাল সেনদের অভিমুখে এগোয় নি। সিনেমার দর্শকের শ্রেণীভেদ থাকেই। সর্বযুগে সর্বদেশেই থাকে। শিক্ষিত দর্শক অশিক্ষিত দর্শক। অনুভবি সংস্কৃতির দর্শক আর সস্তা মনোরঞ্জনের দর্শক। কিন্তু এই বাংলায় এই কলকাতায় সিনেমার দর্শকের একটিই শ্রেণী। আর ঠিক সেই কারণেই সিনেমার জগতে বাঙালির শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলিই হল ফাঁকা পর্দায় দর্শকের অভাবে রিল বন্দী হয়েই পড়ে থেকেছে দিনের পর দিন। বিদেশী পুরস্কারের দৌলতে আর গুপি বাঘা ফেলুদার কল্যাণে সত্যজিতের কয়েকটি ছবি তবু দর্শকের মুখ দেখেছে। নয়তো বাকিদের সব ছবিই গড়ের মাঠের হাওয়া খেয়ে দী্ঘশ্বাস ফেলেছে শুধু। কিন্তু তাই বলে বাঙালির ঘরে ঘরে বিএ বিকম বিএসসি পাশ এমএ এমকম এমএসসি পাশের অভাব আছে, এমন কথা নিন্দুকেরও বলার সাধ্য নাই। ডাক্তার ইঞ্জীনিয়র ব্যারিস্টর জামাই নিয়ে গর্বের শেষ নাই এমন শ্বশুর শাশুরীও অভাব নাই কোন। অভাব আছে চিন্তাশীল অবুভবশীল মৌলিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা সম্পন্ন বাঙালির। অভাব আছে সংস্কৃতি মনস্ক বাঙালির। অভাব আছে প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষিতের।

সিনেমা মানেই সস্তার মনোরঞ্জন। সিনেমা মানেই দেদার ফূর্তি। সিনেমা মানেই হিরো হিরোইনদের নকল করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। সিনেমা মানেই নাচ গান মারপিট। সিনেমা মানেই নায়ক নায়িকার প্রেম। সিনেমা মানেই দারিদ্র থেকে হঠাৎ উত্তরণের রূপকথা। সিনেমা মানেই টিকিটের টাকা উশুল। তাই যাদের সিনেমায় এইসব শর্তগুলির কোনটাই পুরণ হয়ে না, কেন তাদের সিনেমা দেখতে যাবে বাঙালি দর্শক? তাই যায়ও নি কোনদিন। তারা সেই সব সিনেমার লাইনেই দাঁড়িয়ে থেকেছে, সেগুলি এই সব বস্তাপচা প্যাকেজের আড়ত। এই হলো বাঙালির সংস্কৃতি বোধ। সাংস্কৃতিক রুচি। এবং সেই রুচির কারণেই সত্যজিত ঋত্বিক মৃণাল সেনেদের ছবি বক্স অফিসের আনুকুল্য পায় নি কোনদিন। এখান থেকেই যদি শুরু করা যায় দেখতে পাওয়া যাবে, সাধারণ ভাবে বাঙালি শিক্ষাগত পেশাগত ও অর্থনৈতিক স্তরভেদে বিভিন্ন হলেও সিনেমা দেখার রুচিবোধে প্রায় অভিন্ন। বাংলায় বাণিজ্যিক সিনেমার ঠিক এই কারণেই রমরমা। এবং ঠিক এই একই কারণে সত্যজিত ঋত্বিক মৃণাল সেনের ছবির কোন বাজারই ছিল না এই বাংলায়। এই যে শিক্ষাগত পেশাগত এবং অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদে বিভক্ত বাঙালি মানস, সেই বাঙালি মানসের একটি অভিন্ন চরিত্রও উঠে আসে এই সত্য থেকে। সেটি হচ্ছে এই যে, সাধারণত বাঙালি মাত্রেই গভীরতর চিন্তার বিষয়ে অনাগ্রহী। যা কিছু মানুষকে ভাবায় মানুষের চেতনাকে আলোড়িত করে, মানুষের মৌলিক চিন্তাকে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করতে পারে, সেই সব কিছু বিষয় থেকেই বাঙালি দূরে থাকতে পছন্দ করে। শিক্ষাগত পেশাগত ও অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদে বিশেষ কোন তারতম্য ঘটে না। এখানেই বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

না, বাঙালির সংস্কৃতিবোধ নিয়ে গালভরা কথা অনেক হয়ে গিয়েছে। তার ভিতর সারসত্য বিশেষ কিছুই নাই। কয়েকজন সুরকার গীতিকার গায়ক গায়িকা কবি লেখক নাট্যব্যক্তিত্ব চিত্রপরিচালক অভিনেতা অভিনেত্রী শিল্পী কলাকুশলী ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ ক্ষণজন্মা ব্যক্তির সাংস্কৃতিক দিগন্ত নিয়ে একটি জাতির সামগ্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। জাতির সামগ্রিক সংস্কৃতির ভিত সমাজদেহের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। সেই সমাজদেহের সার্বিক রূপই সেই জাতির সংস্কৃতি। তাই রবীন্দ্রনজরুল দিয়েও বাঙালির সংস্কৃতির পরিমাপ হয় না। আসলেই আমাদের চেতনা এতটাই অপ্রাপ্তবয়স্ক যে সংস্কৃতি বলতে আমরা সিনেমা থিয়েটার শিল্পসাহিত্য জগতের কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির প্রতিভা, কাজকর্ম ও খ্যাতির জৌলুস বুঝি। আর সেই বোধ থেকেই আমাদের সংস্কৃতি বলতে সত্যজিৎ ঋত্বিক মৃণাল সেন বিজন উৎপল অজিতেশ শম্ভু মিত্র হেমন্ত কণিকা সলিল চৌধুরীর বেশি কিছু বুঝি না আমরা। সংস্কৃতি যে সমাজের সামগ্রিক অভিমুখ, সমাজের অভ্যন্তরীন প্রকৃতি, সমাজের সার্বিক শিক্ষাদীক্ষা রুচিবোধ মূল্যবোধ চেতনার বহিঃপ্রকাশ, যার সবকিছুরই মধ্যে দিয়ে একটি জাতির সমগ্র সত্ত্বা প্রতিফলিত হতে থাকে, সেই চেতনাই নাই আমাদের। এই জন্যই আমাদের সংস্কৃতির চেতনা আজও প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠতে পারে নি। এবং সেই সংস্কৃতিতেই আমরা গ্রহণ করি না সত্যজিৎ ঋত্বিক মৃণাল সেনদের। তাই তাদের সিনেমা হিট সুপারহিট মেগাহিট হয় না কোনদিনই। যে ধরণের সিনেমাগুলি বছরের পর বছর ধরে হিট সুপারহিট মেগাহিট হয়, হতে থাকে, সেই ধরণের সিনেমার ঘরানাই আমাদের মানসিকতার সাথে খাপ খায়। খায় বলেই সেই মানসিকতাই আমাদের সংস্কৃতির নির্ভেজাল রূপ। আদি ও অকৃত্রিম রূপ। এবং যা আজও রয়ে গিয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্কই। তাই মৃণাল সেনেদের মৃত্যুতে বাঙালিরও ক্ষতি হয় নি কিছুই। বাঙালি হারায়ও নি কিছু। তাঁরা যা রেখে গেলেন, তাও বাঙালির সমাজসংস্কৃতির সমৃদ্ধির কোন কাজেই লাগবেনা বিশেষভাবে। কেননা আমরাই সেসেব কাজে লাগাতে উৎসাহী বা ইচ্ছুক নই। সেটাও আমাদেরই সংস্কৃতি।

২১শে পৌশ’ ১৪২৫

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

মন্তব্য

  1. আপনার লেখা পড়ার পর পিছনের দিকের 6 দশক তাকিয়ে দেখলাম। আমার মনে হল এই যথার্থ কথা ।আমরা দিব্যি পলায়ন বাদী । সত্য র থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি ।

    উত্তর দিনমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন