নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার এবং একটি মূলগত প্রশ্ন



এটা ঠিক আপনি আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। এমনকি সাধারণ ভাবেও ভারতীয় সংবিধানের ধারাগুলির বিষয়ও বিশেষ কিছুই জানি না। নাই জানলাম। দরকার নাই। ধরেই নেওয়া যেতে পারে, আমি আপনি কেউই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র নই। নাই বা হলাম। দরকারও নাই। ভারতীয় রাজনীতির বিষয়েও ধরা যাক আমার আপনার বিশেষ কোন আগ্রহও নাই। নাই থাকলো। দরকার কি? সকলেই রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামালে দেশ চলবে কি করে? এবং আপনি কিংবা আমি কেউই ভারতীয় আইনের কোন ধারা সম্বন্ধেও ন্যূনতম কোন জ্ঞানের অধিকারী নই। আমরা কেউই উকিল ব্যারিস্টর নই। সেটাই স্বাভাবিক। অধিকাংশ ভারতীয়ই তাই। আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই সাধারণ মানুষরাই কাটফাটা রোদে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজ পছন্দ মতো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে। পঞ্চায়েত, পুরোসভা থেকে শুরু করে বিধানসভা ও লোকসভায়। এবং সেই আমাদেরকেই ভোটের লাইনে দাঁড় করাতে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা করজোরে আবেদন করেন, যেন তাঁদেরকেই আমি আপনি নির্বাচনে জয়যুক্ত করি। এবং সেই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোটের লাইনে দাঁড়াতে গেলে আমার আপনার একটিই পথ, ভোটার তালিকায় নাম থাকা। এবং আমাদের নিজ নিজ ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড দেখিয়ে নিজেদের ভোট প্রদান করা। অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিক হিসাবে নাগরিক দায়িত্ব পালন করা। যেটি আমাদের অধিকার ও কর্তব্য। সংবিধান স্বীকৃত।

ভারতবর্ষের পঞ্চায়েত পুরোসভা বিধানসভা ও লোকসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পাঠানোর দয়িত্ব কাদের? আমার আপনার মতোই একশ তিরিশ কোটি ভারতীয় নাগরিকদের। যাঁদের নাম রাষ্টের ভোটার তালিকায় নথিবদ্ধ। রাষ্ট্রের ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত নন যাঁরা, তাঁরা ভারতবাসীই হন, আর ভারতে বসবাস করুন, তাঁদের কি বিধানসভায় লোকসভায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার অধিকার রয়েছে? যে অধিকার প্রয়োগ করতে পারি আমি আর আপনি? অর্থাৎ সোজা কথায়, ভারতবর্ষে বিধানসভা ও লোকসভায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার নিশ্চিত ভাবেই ভারতীয় নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। ভারতবর্ষের সংবিধান বিশেষজ্ঞ না হয়েও কোটি কোটি ভারতবাসী মাত্রেই সেটি জানেন। তাহলে ভারতবর্ষের নাগরিক কারা, এই প্রশ্নের সোজা উত্তর একটিই যাঁরা বিধানসভা লোকসভায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার অধিকার প্রাপ্ত। সেই অধিকারের প্রমাণপত্র কি? প্রমাণপত্র নাগরিকের ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড। সেই অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও রক্ষাকবচ কি? ভারতবর্ষের নির্বাচন কমিশনের ভোটার লিস্টে নথিভুক্ত নাগরিকের নাম ও পরিচয়।

হ্যাঁ এমনটাই জেনে এসেছি আমরা। আচ্ছা বিশ্বে এমন কোন দেশ আছে, যেখানে, সেই দেশে ভোটাধিকার প্রাপ্ত জনগণ রাষ্ট্রের নাগরিক নন? অর্থাৎ আধুনিক গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভোটাধিকার ও নাগরিকত্বের ভিতর কোন পার্থক্য সম্ভব কি? একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তি সেই রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত, এমনটা হওয়া কি সম্ভব? স্বাধীন ভারতেও কি এতদিন সম্ভব ছিল? ভারতের সংবিধান কি বলে সেই কথা? আমি আপনি ভোটাধিকার প্রাপ্ত অথচ ভারতীয় নাগরিক নই? নিশ্চয় আমদের সংবিধান সেকথা বলতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় একজন নাগরিকের সর্বপ্রথম মৌলিক অধিকারই হলো তার ভোটাধিকার। যিনি ভোটাধিকার প্রাপ্ত, সাংবিধানিক ভাবেই তিনিই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিক বলেই স্বীকৃত। এটাই আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত রীতি। বস্তুত নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার একই মূদ্রার এপিঠ ওপিঠ।  ভারতবর্ষ কি তার ব্যতিক্রম হতে পারে?

অর্থাৎ অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ হলেও আমরা জানি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সরকার গড়তে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা ভোটাধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিমাত্রেই সেই রাষ্ট্রের নাগরিক। এই সহজ সরল বিষয়টি যেন আমরা কেউই ভুলে না যাই।

আর ঠিক এইখানেই প্রশ্ন উঠেছে, একটি দেশে ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকের নগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে কেন? আর যদি হয়ই তবে, তার ভোটার আইডেন্টিটি কার্ডই তো সেই প্রমাণপত্র। রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত। সেই পরিচয়পত্র তবে তার নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য হবে না কেন? আসল প্রশ্ন কিন্তু এইখানেই। এই প্রশ্নের সাংবিধানিক দিক, আইনি দিক, রাজনৈতিক দিকগুলি যদি নাও দেখতে যাই আমরা, যদি শুধু শুধমাত্র নৈতিকতার দিকটিই বুঝে নিতে যাই, তবে দেখতে পাবো, এমন চুড়ান্ত অনৈতিক ঘটনা ইতিহাসে সচারচর ঘটে না।

সাম্প্রতিক এনআরসি নিয়ে ওঠা বিতর্ক ঠিক এইখানেই। আসামে বলা হয়েছিল, তোমরা আমাদের ভোট দাও। আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো। আসামে বাঙালি ভোট দিয়েছিল। তাদের ভিতর প্রায় চৌদ্দ লক্ষ হিন্দু ভোটারের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও বোঝানো শুরু হয়ে গিয়েছে, তোমরা আমাদেরকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে আসলেই আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো। আর সেই জন্যেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সিএএ। কি আশ্চর্য্য তাই না? কথায় বলে ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই হাসির লহরী শোনা যাচ্ছে আনাচে কানাচে। মানুষ হাসুক কাঁদুক, কিন্তু সে তো প্রশ্ন করবে। সে প্রশ্ন করবে, আমি তো নাগরিকই্। নাগরিক না হলে তোমরা আমার কাছে ভোট চাইতে আসছো কেন? আমার ভোটে তোমরা ক্ষমতায় আসা মানে তো এই যে, তোমরা আমাদের মতো ভারতীয় নাগরিকদের ভোটেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছো। বা হবে। একজন ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিককে রাষ্ট্র কি করে নাগরিকত্ব দিতে পারে? বিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটি সম্ভব? আবার উল্টো দিক দিয়ে দেখলে, রাষ্ট্রের নাগরিক না হলে একজন কি করে ভোটাধিকার অর্জন করেন? অর্থাৎ যে মুহুর্তে একজন ব্যক্তি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাধিকার প্রাপ্ত হন, সেই মুহুর্ত থেকেই, তিনি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিক বলে স্বীকৃত হন। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি।

ভারতবর্ষে সেই ভিত্তিটাই কি তবে টলিয়ে দেওয়ার আয়োজন শুরু হয়ে গেল? এই প্রশ্ন তুলতে গেলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন কতটুকু? কতটুকুই বা দরকার রাষ্ট্রীয় আইনের খুঁটিনাটি জানার? একজন ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকই কি এই প্রশ্ন তুলতে যথেষ্ট নন। সেই নাগরিকই প্রশ্ন করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়, শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত একটি সরকারের বৈধতা যেখানে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক প্রদত্ত ভোটের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে সেই নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া সম্ভব হয় কোন জাদুতে? নাগরিকদের ভোটে নির্বাচনে জিতে নিয়ে, সেই নাগরিকদেরকেই নাগরিকত্ব প্রমাণের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া কিভাবে সংবিধান সম্মত বিষয় হতে পারে? আবার নাগরিকত্ব প্রমাণের বিষয়ে, সেই ভোটার কার্ডই অবৈধ হয় কিভাবে, যে ভোটার কার্ডের বলে প্রদত্ত ভোটই রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে একটি সরকার নির্বাচিত হয়ে গিয়েছে? অর্থাৎ সংবিধিবদ্ধ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রস্তুত ভোটার লিস্টে নথিভুক্ত প্রত্যেক নাগরিককে রাষ্ট্র তার নাগরিক বলে অস্বীকার করতে পারে কোন সংবিধানের কোন ধারায়। এইটিই হলো একজন নাগরিকের মূল প্রশ্ন।

এনআরসি এনপিআর সিএএ নিয়ে যত বিতর্কই থাক। পক্ষে বিপক্ষে যত ধরণের যুক্তি কুযুক্তিই থাক। আমাদের এই মূল প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গেলে চলবে না। সংবিধান স্বীকৃত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা, নির্বাচন কমিশনের ভোটারতালিকায় নথিভুক্ত থাকা সকল ভোটারই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিক। সেই নাগরিককে কোন সরকারই নতুন করে নাগরিকত্ব দিতে পারে না। পারে না নাগরিকের ভোটারকার্ড অস্বীকার করে, ভোটার লিস্টে নথিভুক্ত নাগরিকের নামকে অস্বীকার করে একজন ব্যক্তিকেও নাগরিকত্ব প্রমাণের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিতে। যে কোন ভারতীয় নাগরিক যদি তিনি মানসিক ভাবে অসুস্থ না হন, তবে এই প্রশ্নে সামিল হবেন। একজন সচেনত নাগরিক হিসাবেই এটি আমার আপনার সকলের নাগরিক দায়িত্ব, অধিকার ও কর্তব্য।

২৪শে ডিসেম্বর’ ২০১৯
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

মন্তব্য