আসুন লাইনে দাঁড়াই


আসুন লাইনে দাঁড়াই

দেখুন বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। মার্কিন বোমায় ইরানী সেনাহত্যায় দুম করে সোনার ভরির বাজারদর লাফিয়ে বেড়ে গিয়েছে। গিয়েছে তো গিয়েছে। তাতে আমার আপানার কি? বাকি ভক্তবৃন্দের মতো আমরাও তো বিশ্বাস করেছি, দেশী গরুর দুধে সোনা আছে। সেই দুধ জ্বাল দিয়ে নিশ্চয় সোনা মিলবে ঘরে ঘরে। আর চিন্তা কি? নতুন করে আমরা জানলাম বিদ্যাসাগরের সহজপাঠ লেখার যুগান্তকারী তথ্য। এও জানা গেল সতীদাহ প্রথা নিবারণে তাঁর অবদানের কথা। বাকি ভক্তবৃন্দের মতো আমরাও বিশ্বাস করলাম। বিশ্বাস না করলে জনসভায় ভক্তবৃন্দের ভিড় বৃদ্ধি করবো কি করে বলুন? সেই ভিড়ে মুমুর্ষু রোগীর এম্বুলেন্স আটকিয়ে যায় তো যাক না। আমাদের সামনে এখন অনেক বড়ো সংকট। ভারতবর্ষের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটার কার্ড আধার কার্ড প্যান কার্ড রেশন কার্ড কোনটিই আমাদের নাগরিকত্বের পরিচয়ও নয় প্রমাণও নয়। যদিও এই সকল কার্ডগুলি চালু করতে, সরকারী কোষাগারের লক্ষ লক্ষ কোটিটাকা খরচ হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সাত দশক ব্যাপি সময়সীমায়। কিন্তু দেখুন বিগত কোন সরকারই আমাদের নাকি নাগরিকত্ব দেয়নি। আর আমরা কেমন বেমালুম বুঝতেই পারি নি?  এবার ভারতবর্ষে কে কে নাগরিক তার পরীক্ষা নেওয়া হবে। পাশ করতে পারলে তবেই জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর তালিকাভুক্ত হওয়া যাবে। আমরাও আহ্লাদে আটখানা। এইবার আমাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে জেনে। ঠিক যেমন গনেশের দুধ খাওয়া দেখে আমাদের বিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল বহুগুন। তেমনই আমাদের বিশ্বাস আরও বেড়ে গিয়েছে, নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ পাশ হওয়ায়। আমরা ঘরে ঘরে বাজি ফাটিয়ে পটকা ফাটিয়ে আনন্দ উদযাপন করেছি সমবেত ভাবে। এইবার মুসলিমরা জব্দ হবে। নতুন আইনে তাদের আর নাগরিকত্ব পেতে হচ্ছে না। ভারতবর্ষে এবার হিন্দুদের রামরাজত্ব। ফলে আমার আপনার মতো হিন্দুদের এই তো সুখের দিন এলো বলে। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তো কত সহজ করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, কি একটা ফর্মে সই করে দিলেই অনেকটা ভোটে জিতে লাড্ডু খাওয়ানোর মতোই তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া হবে। যেটা নাকি বিগত সাত দশকে কোন সরকারই দেয় নি। শুধুমাত্র হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষাকারী সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার চিরাচরিত ভোট রাজনীতির উর্ধে উঠে এতবড় একটা উপকার করতে চলেছে। হ্যাঁ তার জন্য অবশ্য প্রথমে এনপিআর করা হবে। তারপর এনআরসি করে আমাদের নাম নাগরিকপঞ্জীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। কারণ তো আমাদেরকে বলেই দেওয়া হয়েছে, আমাদের ভোটার কার্ড আধারকার্ড প্যান কার্ড রেশন কার্ড কোনটিই ভারতীয় নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র নয়। প্রমাণ নয়। তারপর আমরা আমাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব যাতে প্রমাণ করতে পারি, তার জন্যেই তো সরকার অকুতভয়ে সমস্ত বিরোধীতার মোকাবিলা করে নগরিকত্ব সংশোধনী আইন এনেছে। শুধু আমাদেরই জন্য।

শুধু আমাদেরই জন্য সরকারী তহবিল থেকে মাত্র কয়দিন আগেই এনপিআর বাবদ সরকার সাড়ে আটহাজার টাকা বরাদ্দ করেছে। কারা যেন কেবল প্রচার করে চলে জনবিরোধী সরকার? তাদের কি চোখ কান খোলা নাই? শুধুমাত্র আমাদের জন্য একটি সরকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার কাজে ৮৫০০ কোটি টাকা দিয়ে দিল। এরপর আসছে এনআরসি, আরও হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যায় করবে সরকার। কেন করবে? শুধু আমাদেরই জন্য তো? কি দরকার ছিল সরকারের? যে কাজ বিগত সাত দশকের কোন সরকারই করে নি। করে নি শুধু মাত্র ভোট রাজনীতির দিকে তাকিয়ে। হ্যাঁ একমাত্র আমি আপনিই বুঝতে পারি, কতটা জনদরদী সরকার হলে এমন ভাবে জলের মতো টাকা খরচ করতে পারে। ভাবুন একবার। দেশের প্রধান তো বলেই দিয়েছেন, এই তো সেদিনও স্বামীজীর সাধের বেলুড় মঠে তাঁর রাজনৈতিক ভাষণে স্পস্ট করে দিলে, নাগরিক সংশোধনী আইন ২০১৯ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া জন্য করা হয় নি। করা হয়েছে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য। তাঁর সুষ্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষণে যখন তিনি তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে জিজ্ঞাসা করলেন, নিপীড়িত নির্যাতীতদের কি আমরা নাগরিকত্ব দেব না? তখন সমবেত ভক্তবৃন্দ সমস্বরেই তো তাঁদের সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন। তারপরেও আমরা তাঁকে ফিরে যেতে বলতে পারি কখনো?

দেখুন বিশ্বাসে মিলায় নাগরিকত্ব। তর্কে যায় পিছিয়ে। তাই আর তর্ক করবেন না দয়া করে। সরকারের কথায় ভরসা করুন। বিশ্বাস করুন সরকারের চ্যালাচামুণ্ডার কথায়। বিদেশে গচ্ছিত কালোটাকা উদ্ধারের পর আমার আপনার ব্যাংক ব্যলেন্সে ১৫ লক্ষ করে টাকা ঢুকে যাবে। বিশ্বাস তো করেছিলেন। আর দেখতেও পারছেন সারা দেশের মানুষও সেই বিশ্বাসে একই সরকারকে আবারো বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। তাই সরকার তো আছে এখনো। ফলে ১৫ লক্ষ টাকার গল্পটা অবিশ্বাস করার কিছু আছে কি? হাতে তো এখনো চার চারটি বছর রয়েছে। তাই না? ঠিক তেমনই বিশ্বাস ধরে রাখুন। বছরে ২ কোটি চাকুরির ব্যবস্থা ঠিকই হবে। আগে তো দেখে নিতে হবে, কে নাগরিক আর কে নয়? তাই না? একজন ভারতীয় নগরিককেই তো সরকার চাকুরী দেবে। তাই সকলের আগে নাগরিকত্বের প্রমাণটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাতে একজন অনাগরিকও সরকারী চাকুরী না পায়। তাই এত সতর্কতা। এটাকে সরকারের অদক্ষতা বা মিথ্যাচার বলে যারা প্রচার করছে, বিভ্রান্ত হবে না তাদের কথায়। বরং আস্থা রাখুন তাদের উপরেই যারা জানিয়ে দিচ্ছেন বিশ্বে প্রথম টেস্টটিউব বেবি সীতা। প্রথম প্লাস্টিক সার্জারী হয়েছিল সিদ্ধিদাতায় গণেশের। গরুর মূত্রসেবনে ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি নির্মূল হয়ে যায়। কেন শুধু শুধু কেমো নিতে গিয়ে ভিটে বাড়ি বন্ধক রাখবেন? বরং প্রতিদিন গরুর পিঠে হাত বুলাতে থাকুন, দেখুন প্লাডপ্রেশার কেমন স্বাভাভিক হয়ে যায়। নিখরচায় এমন সব ওষুধের উপায় বিলিয়ে দিচ্ছে যারা, তাদের মতো দেশসেবক বিগত সাত দশকে দেখেছেন কোন দিন। হ্যাঁ একটাই শুধু চিন্তার কথা, যখন তখন পুলওয়ামার মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তবে নিশ্চিত জানবেন সেসবই বৈদেশিক শত্রুর যড়যন্ত্র। আমাদের জনদরদী সরকারকে উৎখাত করার অভিসন্ধিতে। তাই সরকার বিরোধী কোন স্লোগানে গলা মেলাবেন না। কারণ আপনি আমি দেশপ্রেমিক। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের সরকার বাহাদুর প্রকৃত বাহাদুরের মতোই আমাদের রক্ষা করবে। বিপদে আপদে। ঠিক যেমন করেছিল বালাকোটে। নির্বাচনের প্রাকমুহুর্তে! আবারও করবে। ঘাবড়াবেন না। ঠিক কখন দেশরক্ষায় এক একটি বালাকোট করতে হয়, সেই বিষয়ে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বিশেষজ্ঞ দেশপ্রধান ওয়াকিবহাল আছেন। তাই সারাদেশে ছাত্র বিক্ষোভ দেখে আমার আপনার চিন্তা করার কিছু নাই। আমরা জানি, আমরা সময় মতো পদ্মফুটিয়েছি। তাই আমরা সুরক্ষিত।

তাই ভুলেও আর কোন প্রশ্ন করবে না। জানতে চাইবেন না, ভোটারকার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ না হলে আমি আপনি ভোট দিচ্ছি কি করে? কাদের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে সরকার। প্রশ্ন করবেন না। বিভিন্ন ফৌজদারী মামলায় বিচারাধীন, যার ভিতর ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধও আছে, ১১৬ নির্বাচিত সাংসদের সমর্থনে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ কতটা সাংবিধানিক? কতটা নৈতিক? আমি আপনি না দেশপ্রেমিক? আমি আপনিই না পদ্মফুটিয়েছি! তাই আমরাই যদি এইসব দেশবিরোধী প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দিই, তবেতো আমাদের থেকে বড়ো দেশদ্রোহী আর কেউ নয়। দেশ প্রধান যখন বলেছেন, দেশে ডিটেনশন ক্যাম্প নাই, তখন সূর্য পশ্চিমে উঠলেও সেটি সত্য ধরে নিতে হবে। খবরের কাগজে কি লেখা হচ্ছে, কেন পড়বেন? সারাদেশে বেশির ভাগ মানুষই তো অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নয়। তারা কি খবরের কাগজ পড়ে সত্য জানবে? নাকি দেশপ্রধানের জনসভায় ভিড় বাড়িয়ে জমায়েত হয়ে সত্য জানবে বলুন্? লোকসভায় কে কি বল্ল, তাই নিয়ে যারা হল্লা করছে কান দেবেন না তাদের কথায়। সারা ভারতে কজনের বাড়ি টিভি আছে মশাই। আর কজন লোকসভার লাইভ টেলিকাস্ট দেখে? না আপনিও দেখবেন না। বরং শুনুন আপনার দেওয়া ভোটে নির্বাচিত প্রার্থীর চ্যালাচামুণ্ডারা পাড়ায় পাড়ায় কি বলছে। বিশ্বাস করুন তাদের, তারা ঠিক সেটাই বলবে, যেটি জানা প্রয়োজন আপনার। বেশি জানার কি দরকার বলুন আমার আপনার?

তাই আসুন, আমরা ঠিক সেইটুকুই জানি যেটুকু জানাচ্ছে, জানাবে আমাদের সরকার। আমাদের সাংসদ। আমাদের বিধায়ক। ক্ষমতাসীন দলের নেতানত্রী থেকে শুরু করে পাড়ার বাহুবলীরা। সেইটুকু জেনে নিশ্চিন্তে লাইনে দাঁড়াই চলুন। যখন যে লাইনে দাঁড়াবার নির্দেশ আসবে। যে যে কাগজপত্র চাওয়া হবে তাই নিয়ে। দেশপ্রেমিক ভক্তবৃন্দের মতো সেটাই আমাদের কর্তব্য। প্রকৃত দেশসেবকদের হাতে যখন দেশ, তখন দেশবাসী হিসাবে আমাদের একটই কর্তব্য। অন্ধভক্তিতে হাততালি দেওয়া। অন্ধবিশ্বাসে ভরসা করা। অন্ধকারে ভিড় বাড়ানো।

১৩ই জানুয়ারী ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত


মন্তব্য